ইতিহাস

ফিলিস্তিন কি ভুল করেছিল ৯২ বছর আগেই?

ফিলিস্তিন পৃথিবীর একমাত্র অভাগা দেশ যারা সব কিছু থাকা সত্ত্বেও বাস্তুহারা, তারা একটাই ভুল করেছিল আর তা হলো ইহুদিদের আশ্রয় দিয়ে। ফগ ফায়ারের এই পর্বে জানবো ফিলিস্তিন কি ভুল করেছিল ৯২ বছর আগেই সেই সম্পর্কে।

বর্তমানে গুগলে আপনি ফিলিস্তিনিদের লিখে অনুসন্ধান করলে এই নামে মানচিত্রে কিছুই পাবেন না, দেখবেন সেখানে লেখা ইসরাইল! আজ থেকে প্রায় ৯১ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৩০ সালের দিকে পোল্যান্ড থেকে প্রথম বারের মত একদল ইহুদীর আগমন ঘটে ফিলিস্তিনের কিটবুস নামক এলাকায়। ফিলিস্তিনের গাজা শহর থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরেই ছিল কিটবুশের অবস্থান, কিটবুসে নব্য ইহুদিরা এসেই শুরু করলো কৃষি কাজ, ধীরে ধীরে তারা কৃষি খামার গড়ে তুলতে লাগলো কিটবুসের বিভিন্ন স্থানে ।

তবে কিটবুস কিন্তু কোন মরুভুমি ছিল না, সেখানে কয়েক শতাব্দী ধরে শান্তিতে বসবাস করে আসছিলো ফিলিস্তিনের আরবেরা। ছিল না তাদের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব কিংবা সংঘাত, সব ঠিকঠাক চলছিল। অন্যদিকে কিটবুসের আরব বাসিন্দারাও কৃষি নির্ভর ছিলেন, যার জন্য ইহুদিদের এই স্থানে শিকড় ছড়ানো বেশ সহজ ছিল বলা চলে। কারণ তারাও কৃষি কাজের ছুতো দিয়েই কিটবুসে এসেছিলো, ইহুদিরা যেহেতু অন্য দেশ থেকে কাজ করতে কিটবুসে এসেছে, তাই তাদের সেখানকার বাসিন্দারা অনেকটা মেহমানের মতোই সমাদর করতেন। স্থানীয় আরব এবং ইহুদিদের সস্পর্ক ছিল বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ, সহমর্মিতার কোন কমতি ছিল না তবে ইহুদিরা যে ছক কোষে ফিলিস্তিনের কিটবুসে তাবু গেড়েছে এটা সহজ সরল বাসিন্দারা একটুও আচ করতে পারেনি।

যখন ইহুদিরা ঝাঁকে ঝাঁকে কিটবুসে আসা শুরু করলো আর ইচ্ছে মত জমি কিনতে লাগলো, তখন স্থানীয়দের টনক নড়লো, তারা বুঝতে পারলো এভাবে চলতে থাকলে কিছুদিন পর তারাই নিজেদের জমির ভাড়াটে হয়ে যাবে। পরবর্তিতে ইসরাইল নামক রাষ্ট্র যখন ফিলিস্তিনের পেট চিরে বের হলো, তখন ৭ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি মানুষ হয়ে পড়লেন উৎবাস্তু, আজো সেই সাতলাখ মানুষ নিজেদের জমি, বাড়িঘর বুঝে পাননি। ইসরাইল তাদের কোনদিন সেখানে প্রবেশ করতে দেয়নি। ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্টার কাজ ১৯৩০ সালে শুরু হয়নি, হয়েছিল ১৮৯৭ সালে। কি অবাক হচ্ছেন? আসলে ইসরাইলি একমাত্র রাষ্ট্র যারা ৩৩ বছর ধরে শুধু নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা কষে গেছে। ১৮৯৭ সাল থেকেই বিভিন্ন দেশে  দমনের শিকার ইহুদিরা চেয়েছিলেন নিজেদের জন্য একবারে আলাদা একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে, এক্ষেত্রে ব্রিটেন ছিল নাটের গরু। কারণ ব্রিটেনই ফিলিস্তিনে ইহুদিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। ১৯১৭ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩১ বছর ব্রিটিনের নিয়ন্ত্রণে ছিল ফিলিস্তিন। 

১৯১৭ এর দিকে যখন তুরস্কের সৈন্যদের হটিয়ে জেরুজালেমের দখল নিয়ে নেয় ব্রিটেন। ঠিক তখন ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ফিলিস্তিনের মাটিতেই ইহুদিদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের জন্য যা যা করা দরকার তারা করবে।

আর তারই ধারাবাহিকতায়, ব্রিটেনের তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী বেলফোর ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন ইহুদি নেতা ব্যারন রটসচাইল্ডকে। চিঠিটা ছিল ইহুদিদের কাছে ব্রিটেনের প্রতিশ্রুতি যাতে পরিষ্কার করা হয়েছিল যে, ফিলিস্তিনের জমিতেই প্রতিষ্ঠা করা হবে ইহুদি একটা রাষ্ট্র। ইহুদিদের মূলত ইউরোপে কেউই পছন্দ করতনা, যার জন্য ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা তাদের জন্য দিনকেদিন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছিল। ইউরোপের এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই ইহুদিদের একটি নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনের চিন্তাকে আরো শক্তিশালী করেছে। 

যখন ১৯৩৩ সালের পরের সময়ে হিটলার ইহুদিদের প্রতি কঠোর অবস্থানে যেতে শুরু করেন দিশে হারা হাজার হাজার ইহুদি জাহাজে করে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে পালাতে থাকে, যা ছিল তাদের পরিকল্পনারই অংশ, আর তখনি ফিলিস্তিনি আরবরা বুঝতে পারেন, তাদের অস্তিত্ব বিলীন হবার পথে। এর পরের গল্পটা অনেকটা এরকম, ফিলিস্তিনের আরবেরা বিদ্রোহ শুরু করলো ব্রিটেনের সৈন্য আর ইহুদিদের বিরুদ্ধে। ব্রিটেনের সৈন্য আর ইহুদিরাও হাত গুটিয়ে বসে থাকলো না, তারাও আরবদের কোনঠাসা করতে লাগলো। অনেকটা স্ক্রিপ্টেড নাটকের মতোই সবকিছু এগুতে থাকে, একসময় আন্দোলন প্রকট আকার ধারণ করে।

ব্রিটেন কৌশলে জাতিসংঘ পর্যন্ত সমস্যাটা টেনে নিয়ে যায়, আর ১৯৪৭ সালে জাতিসঙ্গ সমাধান দিলো দুটো আলাদা রাষ্ট্র গঠনের। ফিলিস্তিনের আরবরা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলো, অবশেষে ইহুদিদের সাথে বার বার সংঘাত হলো অনেক বিদ্রোহ আন্দোলন হলো। কিন্তু ইহুদিরা নিজেদের নিজেরাই স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা দিলো, এভাবে ধীরে ধীরে ইহুদিরা নিজেদের সংখ্যা আর শক্তি বৃদ্ধি করতে করতে একসময় পুরো ফিলিস্তিনটাই দখলে নিয়ে নিলো। ফিলিস্তিন পৃথিবীর একমাত্র অভাগা দেশ যারা সবকিছু থাকা সত্ত্বেও বাস্তুহারা। তারা একটাই ভুল করেছিল আর তা হলো ইহুদিদের আশ্রয় দিয়ে।

এ সম্পর্কিত আরও পরুন

আপনার মতামত দিন

Back to top button
%d bloggers like this: