জীবনধারা

কে.জি.এফ সিনেমার রকি ভাই এর অজানা গল্প

পাওয়ারফুল মানুষেরা সবসময় পাওয়ারফুল জায়গা থেকে আসে না! কে.জি.এফ সিনেমার রকি ভাই অর্থ্যাৎ অভিনেতা যশ-ই এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ!

কে.জি.এফ সিনেমার রকি ভাই, বর্তমান সময়ে সিনেমা প্রেমীদের কাছে তুমুল এক জনপ্রিয় চরিত্রের নাম। কে.জি.এফ সিনেমার এক দৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়েই বলা হয়েছিল- Powerful People Come from Powerful Places (পাওয়ারফুল পিপল কাম ফর্ম পাওয়ারফুল প্লেসেস), অর্থাৎ পাওয়ারফুল লোকেরা সবসময় পাওয়ারফুল জায়গা থেকেই আসে। কিন্তু আসলেই কি তাই? বাস্তবে কি সবসময়ই এমনটা হয়? হয়তো না।

আর হয় না বলেই হয়তো সামান্য একজন বাস চালকের সন্তান হওয়া সত্বেও আজকের রকি ভাই, অৰ্থাৎ বাস্তবের অভিনেতা যশের জন্ম হয়েছে! বর্তমানে কন্নড় ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা যশ। তাই নির্মাতাদের সবচেয়ে কাঙ্খিত তারকাদের একজনও তিনি। তবে শুধু কন্নড় ইন্ডাস্ট্রির নির্মাতারাই নয়, যশ চাইলে তাকে নিয়ে এখন কাজ করতে রাজি বলিউডের অনেক নামি-দামি নির্মাতাও।

এই যে চারপাশে যশের এখন এতো নাম ডাক, এতো পরিচিতি, ভক্তদের এতো আনাগোনা, কিন্তু শুরুটা কি এমন ছিল? না, মোটেই না। শুনলে হয়তো অবাক হবেন, এই যশকেই একদিন  হাতে মাত্র ৩০০ রুপি সম্বল করে বাড়ি ছেড়ে পালতে হয়েছিল! যশের জন্ম ভারতের কর্ণাটকের ছোট্ট এক গ্রামে। তখন তার নাম ছিল নবীন কুমার গৌড়া

গ্রামের স্কুলে পড়ার সময়ই একবার মঞ্চ নাটক করার সুযোগ পান যশ। আর জীবনে প্রথমবার অভিনয় করেই তিনি বুঝতে পারেন এই অভিনয় জিনিসটাই তার জন্য, তিনি জন্মেছিলেন মূলত অভিনেতা হওয়ার জন্য। এরপর আর দেরি করলেন না, সিদ্ধান্ত নেন থিয়েটারে কাজ করতে চলে যাবেন বেঙ্গালুরুতে। স্বভাবিকভাবেই সেই পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন বাবা-মা। বাস ড্রাইভার বাবা আর গৃহিনী মা বুঝালেন ছেলেকে আর বললেন- মাথা থেকে এসব অভিনয়ের চিন্তা-ভাবনা ঝেড়ে ফেলে পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে।

কিন্তু ছেলে তো তার সিদ্ধান্তে অটল। তাই বাবা এক প্রকার হুমকি দিয়ে দিলেন- একবার বাড়ি থেকে গেলে বাড়ির দরজা তার জন্য চিরদিনের মতো বন্ধ। এই হুমকি মাথায় রেখেই মাত্র ৩০০ রুপি পকেটে নিয়ে বাড়ি থেকে পালান যশ। পা রাখেন অচেনা বেঙ্গুলুরুতে। ভীষণ ভয় পাচ্ছিলেন। কারণ এতো বড় শহর, অথচ তার চেনা মানুষ নেই একটিও। কিন্তু মনে ছিল আত্মবিশ্বাস, সংগ্রাম করার অদম্য সাহস। শুরু করলেন থিয়েটারে থিয়েটারে কাজ খোঁজা। কিন্তু কে দিবে সম্পর্ণ একটি অচেনা ছেলেকে কাজ।

আজ এখানে তো কাল ওখানে এভাবেই দিন কাটছে। এরমধ্যে পকেটে টাকা না থাকায় রাতে থাকতে হয়েছে বাসস্ট্যান্ডেও! একসময় ভাগ্য বিধাতা ফিরে তাকালেন যশের দিকে। কাজ পেলেন একটি থিয়েটারে, কিছুই জানতেন না তখন। ব্যাক স্টেজে বসে চা নাস্তা এনে দেয়ার কাজ করতেন। কিন্তু এই কাজটিও যশ খুব মনোযোগ দিয়ে করতেন। কারণ তিনি জানতেন, যদি ফিরে যান তাহলে বাবা-মা আর কখনোই তাকে বেঙ্গালুরু ফিরে আসতে দিবেন না। তাই নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে চোখ বন্ধ করে কাজ করতে থাকেন যশ।

আর এভাবেই একদিন সুযোগ আসে নিজের জাত চেনাবার। ছোট একটা চরিত্র পান করার মতো। আর স্টেজে সেই অল্প সময়ের পারফর্মেন্সেই নজর কেড়ে নেন সবার। কিন্তু যশের নজর তো বরাবরই বড়পর্দার দিকে। চেষ্টা-চরিত্র করতে থাকেন সেখানে কিছু করার। এভাবেই একসময় সুযোগ পান একটি সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার। কিন্তু বিধি বাম, যে সিনেমায় তার কাজ করার কথা ছিল সেটি শুটিং শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। আবার কাজের সন্ধানে পথে নামেন যশ, ঘুরতে থাকেন থিয়েটারে থিয়েটারে।

নানান জায়গায় অডিশন দেয়ার পর অবশেষে সুযোগ মিলে আরেকটি থিয়েটারে। সেখানে অল্প কিছুদিন কাজ করার মাধ্যমেই যশ নজর কাড়েন সিরিয়াল পরিচালকদের। আস্তে আস্তে যশ হয়ে উঠেন কর্ণাটকের জনপ্রিয় সিরিয়াল অভিনেতাদের একজন। আর একটি সিরিয়ালে যশকে দেখেই একজন পরিচালক তাকে প্রস্তাব দেন মোগিনা মানাসু নামক একটি সিনেমায় পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করার জন্য। আজীবন বড়পর্দায় কাজ করতে চাওয়া যশ সাথে সাথেই  লুফে নেন এই প্রস্তাব। নিজের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দিয়ে করেন চরিত্রটা।

এমনকি এই সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি পেয়ে যান ফিল্ম ফেয়ার শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব চরিত্রের পুরস্কারও। এরপর আর কখনো পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি যশকে। আসতে থাকে একের পর এক সিনেমার অফার। আর ২০১৮ সালে কে.জি.এফ মুক্তি পাওয়ার পর তো বদলে যায় সব হিসেবে-নিকেশ। শুধু ভারত নয়, অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে রকি ভাই অর্থাৎ যশের সুখ্যাতি।

তবে শুধু কি যশ? মানুষজন প্রথমবারের মতো জানতে পারেন কন্নড় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কেও। জানতে পারেন এই ইন্ডাস্ট্রির কোনো সিনেমাও যে শাহরুখ খানের কোনো সিনেমাকে পিছনে ফেলে বক্স অফিস মাতাতে পারে। আর কে.জি.এফ বা যশের এমন সাফল্যই তো প্রমান করে পাওয়ারফুল মানুষেরা সবসময় পাওয়ারফুল জায়গা থেকে আসে না, কখনো কখনো সাধারণ কোন মানুষও কোন জায়গাকে পাওয়ারফুল করে  তুলতে পারে।

এ সম্পর্কিত আরও পরুন

আপনার মতামত দিন

Back to top button
%d bloggers like this: