জীবনধারা

এলএসডি | এলএসডি মাদক কি

সাইকেডেলিক মাদকের আলোচনা আসলেই, এলএসডির নাম আসবে সবার প্রথমে । সাইকেডেলিক বা এলএসডি মাদক হল এমন এক ধরনের ড্রাগ যা ব্যবহারের ফলে মানুষ বাস্তব আর অবাস্তবের পার্থক্য ভুলে যায়।

এলএসডি মূলত এক ধরনের এসিড। এর পূর্ণ নাম হল লাইসার্জিক এসিড ডাই-ইথ্যালামাইড। সম্প্রতি বাংলাদেশে এলএসডির প্রভাবে একজন  বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনায়, ভয়াবহ এই মাদক ব্যাপকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

রায় জাতীয় শর্ষের গায়ে জন্মানো এক বিশেষ ধরনের ছত্রাকের শরীরে লাইসার্জিক এসিড উৎপন্ন হয়, এই এসিড রাসায়নিক সংশ্লেষণের মাধ্যমে এলএসডি বানানো হয়। ১৯৩৮ সালে সুইজারল্যান্ডের রসায়নবিদ আলবার্ট হফম্যান সর্ব প্রথম এলএসডি বানিয়েছিলেন, কিন্তু তারও ৫ বছর পর ১৯৪৩ সালে তিনি এলএসডি সাইকেডেলিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে পারেন, আলবার্ট হফম্যান নিম্ন রক্তচাপ ও শ্বাস-প্রশ্বাস উন্নত করার ঔষদ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই শক্তিশালী এই মাদক বানিয়ে ফেলেন। হফম্যান বলেন আমি এলএসডি আবিষ্কার করিনি, এলএসডি আমাকে খুঁজে নিয়েছে। ১৯৫০ ও ১৯৬০ এর দশকে মানসিক রোগ বিষন্নতা, দুশ্চিন্তা ও অবসাদের চিকিৎসায় পরীক্ষামূলকভাবে এলএসডির ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ চিকিৎসার জন্য এলএসডির ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। 

এলএসডি এতটাই ভয়াবহ যে এর পরিমান মাইক্রোগ্রামে হিসেব করা হয়, ১ মাইক্রোগ্রাম হলো ১ গ্রামের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ। সাধারণত এলএসডির একটি ডোজ ৪০ থেকে ৫০০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে, যা একটি বালু কণার ১০ ভাগের ১ ভাগ মাত্র। অর্থাৎ এতো সামান্য পরিমান এলএসডি গ্রহণ করলেও যে কারো নেশা হতে পারে। মাদক হিসেবে এলএসডি ব্লটার কাগজে বিক্রি করা হয়, এই কাগজ জিব্বার উপরে বা নিচে রেখে এলএসডি সেবন করা হয়। 

এলএসডি গ্রহণের পর তা মানুষের মস্তিষ্কের সেরোটোনিন নামক রাসয়নিকের কার্যক্রম প্রভাবিত করে, যার ফলে মানুষের শ্রবণ এবং দর্শনিন্দ্রিয় অতি সক্রিয় হয়ে যায়। সেকারণেই এলএসডি সেবনের পর মানুষ অদ্ভুত রকমের আলো বা রং দেখতে পায়, কেঊ আবার অস্বাভাবিক শব্দ শুনে, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব নেই। এই অবস্থাকে বলে LSD Trip। এলএসডি ট্রিপে থাকাকালীন সময়ে মানুষ অস্বাভাবিক আচরণ করে, অনেকের মধ্যে আত্মঘাতী প্রবণতা দেখা যায়। এধরণের খারাপ অনভুতিকে বলা হয় Bad Trip। ব্যাড ট্রিপের কারণে মানুষ অমূলক ভয় পায়, মুহূর্তের মধ্যেই মারাত্মক দুশ্চিন্তায় ভোগে, আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পরে, নিজের বা অন্যের ক্ষতি করার প্রবণতা তৈরি হয়। এছাড়া এলএসডির কারণে মানুষের হৃদস্পদন, রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাত্রা এবং শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এলএসডি সেবনের আধা ঘন্টার মধ্যে ট্রিপ শুরু হয়ে যায়, ব্যক্তি ভেদে তা ৬ থেকে ১২ ঘন্টা পর্যন্ত থাকে। তবে সেবনের মাত্রার উপর ভিত্তি করে কারো উপর ২০ ঘন্টা পর্যন্ত এলএসডি কার্যকর হতে পারে। 

অনেকের ক্ষেত্রেই চরম অনিদ্রা দেখা দেয়, কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত ঘুমায়, বিষন্নতায় ভোগা  ব্যক্তিরা এলএসডি সেবনের পর আরো বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে। এছাড়া অনেকে মনে করে এলএসডির প্রভাবে তাদের শরীরে অতিমানবীয় শক্তি চলে এসেছে, এমন কল্পনা থেকেও বহু দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। 


বিশেষজ্ঞরা মনে করেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ একক মাদক হিসেবে এলএসডি গ্রহণ করে না, অর্থাৎ যারা অন্যান্য মাদকে আসক্ত তাদের ক্ষেত্রেই এলএসডির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। হিরোইন বা ইয়াবার তুলনায় এলএসডি তুলনামূলক কম আসক্তিকর, তাই বলে এটি মোটেও নিরাপদ নয়। প্রচলিত যেকোন মাদকের তুলনায় এলএসডি হাজারগুন শক্তিশালী। এলএসডির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো Flashback। এলএসডি সেবনের কয়েকদিন, কয়েকমাস বা বছর খানেক পরেও মাদকগ্রহণ ছাড়াই মস্তিষ্কে হুট্ করেই এলএসডি প্রভাব ফেলতে পারে একেই এলএসডির ফ্ল্যাশব্যাক বলে। ফ্ল্যাশব্যাকের কারণে দীর্ঘ মেয়াদি মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। অনেকেই বাস্তব ও অবাস্তবের পার্থক্য ভুলে যায়, অর্থাৎ জীবনে মাত্র একবার এলএসডি গ্রহণ করলেও মানুষের মস্তিস্ক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।

এ সম্পর্কিত আরও পরুন

আপনার মতামত দিন

Back to top button
%d bloggers like this: