ইতিহাস

আল-আকসা মসজিদের ইতিহাস | মসজিদুল আকসা বা বাইতুল মুকাদ্দাস-এর ইতিহাস

ইসলামের অন্যতম গুরুত্ববাহী একটি স্থাপনা আল আকসা মসজিদ যা মসজিদুল আকসা বা বাইতুল মুকাদ্দাস নামেও পরিচিত, মসজিদুল আকসা অর্থ দূরের মসজিদ। এই মসজিদটি ইসলামের কিবলা হিসেবে ব্যবহিত হয়ে থাকে। বর্তমানে মসজিদটি মুসলিমদের অধিকারে থাকলেও ভৌগলিকভাবে এই অঞ্চলটি দখল করে রেখেছে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল। ফগ ফায়ারের এই পর্বে জানবো ইসলাম ধর্মের তৃতীয় পবিত্র স্থাপনা মসজিদুল আকসা বা বাইতুল মুকাদ্দাস সম্পর্কে।

ইতিহাসে বর্ণিত আছে যে পবিত্র কাবাঘর নির্মাণের ৪০ বছর পর হজরত ইয়াকূব (আ.) (আলাইহিস সালাম) জেরুজালেমে মসজিদুল আকসা নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে হজরত দাউদ (আ.) এর (আলাইহিস সালামের) নির্দেশে হজরত সুলাইমান (আ.) (আলাইহিস সালাম) মসজিদটি পুনঃনির্মান করেন, পূর্বে এর নাম ছিল “বাইতুল মুকাদ্দাস” পরবর্তীতে কোরআন শরীফে নামকরণ করা হয় আল মাসজিদুল আকসা।

পবিত্রতার দিক থেকে মক্কা ও মদিনার পরেই মসজিদুল আকসার স্থান, কাবা শরীফের পূর্বে এই মসজিদুল আকসা ছিল মুসলমানদের প্রথম কিবলা, আল কোরআনের উল্লেখিত পবিত্র স্থানগুলোর মধ্যে মসজিদুল আকসা অন্যতম। নবী করিম (স.) (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম) মক্কার মসজিদুল হারাম, মদিনার মসজিদে নববী, এবং মসজিদুল আকসার উদ্দেশ্যে সফরকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছেন, হাদিস মতে হিজরতের এক বছর আগে সাতাশ রজব মিরাজের রাতে মহানবী (সা.) (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম) প্রথমে বায়তুল আকসায় উপনীত হন। 

এরপর বোরাককে বাইরে বেঁধে মহানবী (সা.) (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম) মসজিদুল আকসায় প্রবেশ করেন এবং সেখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। মসজিদুল আকসা কোন একক মসজিদ নয়। মসজিদে কিবলি, মসজিদে মারোয়ানি, মসজিদুল করিম, মসজিদুল বোরাক এবং তুব্বাতুর  সাকাম এই পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন মসজিদের সমন্বয়ে মসজিদুল আকসা গঠিত। ২৭ একর ভূমির উপর অবস্থিত এই মসজিদে একসাথে পাঁচ হাজার মানুষ নামাজ আদায় করতে পারে। 

এই মসজিদের ওযু করার ঝর্ণাটি আলকাস বা পেয়ালা নাম পরিচিত। ইসলামী বর্ণনা মতে ১৪০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে চার দেয়াল ঘেরা পুরু অঞ্চলটি মসজিদুল আকসা হিসেবে বিবেচিত, এর মধ্যে মসজিদে গুম্বজে শাখারা, মূল আকসা মসজিদ, মসজিদে নিসা ও মাদ্রাসাসহ প্রকান্ড ময়দান রয়েছে।  এর ঠিক মাজখানে রয়েছে গোলাকৃতি দুম অফ দা রক বা গুম্বজে শাখারা, শাখারা অর্থ পাথর এটি বিশ্বের বুকে থাকা তিনটি বরকতময় পাথরের মধ্যে একটি, ওপর দুইটি বরকতময় পাথর হল পবিত্র মক্কার হাজরে আসওয়াদ ও মাকাইমে ইব্রাহিম এই পাথরের সৌজন্যে ওমায়া খলিফা আব্দুল মালেক বিন মারুয়ান গুম্বজে শাখারা নির্মাণ করেন, যার ঠিক মধ্যেখানে রয়েছে বরকতময় পাথরটি, এই পাথরের রয়েছে তাৎপর্যময় ইতিহাস হজরত ইব্রাহিম (আ.) (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর আদেশে এই পাথরের উপরেই তার প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করতে উদ্দ্যোত হয়েছিলেন । হাদিসের বর্ণনা থেকে জানা যায় মহানবী (সা.) (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম) এই পাথরের উপর বসেছিলেন।

মসজিদুল আকসার নিয়ন্ত্রণ একাধিকবার হাতবদলের সময় মসজিদের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ১৯৬৯ সালে ইসরাইলের সহয়তায় একজন উগ্র ইহুদি আল আকসা মসজিদের একাংশে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর থেকে আমেরিকা ও ইসরাইলের প্রকাশ্য ও  গোপন মদদে মসুলমানদের প্রথম ও পবিত্র এই কিবলার উপর নানা সময়ে আক্রমণ অব্যাহত থাকে। ৭৪৬ সালে একটি ভূমিকম্পে মসজিদুল আকসা পুরুপুরি ধ্বংস হয়ে যায়, ৭৫৪ সালে খলিফা আল মনসুর পুনরায় মসজিদটি নির্মাণ করেন। 

৭৮০ সালে এই মসজিদটি আবার সংস্কার করা হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১০৩৩ সালে মসজিদটি আরো একটি ভূমিকম্পে আবারো ধ্বংস হয়ে যায়। দুই বছর পর খলিফা আলি আজ জাহির আবারো সেই একই জায়গায় মসজিদটি পুনঃনির্মান করেন, বর্তমান মসজিদুল আকসা খলিফা আলীর বানানো জায়গার উপরি দাঁড়িয়ে রয়েছে।

এছাড়াও বিভিন্ন ধাপে সংস্কার কাজের সময় মসজিদের মিম্বার ও মিনারসহ বেশ কিছু অংশ সংযোজন করা হয়। ৬৩৮ সালে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সময়ে  জেরুজালেম মসুলমানদের অধিকারে আসে। এর ৪৬১ বছর পর এই পবিত্র জায়গা নিয়ে ইহুদি, খ্রিস্টান ও মসুলমানদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

খ্রিস্টান ধর্মালম্বীদের মতে, এই জায়গাটি তাদের পবিত্র স্থান টেম্পল মাউন্ট। এই দ্বন্দ্বের জেরে শুরু হয় এক ঐতিহাসিক যুদ্ধ যা আজও পর্যন্ত চলমান রয়েছে। ১০৯৬ সালে খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা সিরিয়া ও ফিলিস্তিনি অংশ দখল করে নেয়। এ সময় মসজিদুল আকসাকে তারা একটি গির্জায় পরিনিত করে, তারপরে শুরু হয় বিখ্যাত ক্রুসেড যুদ্ধ। 

৮৮ বছর ক্রিস্টানদের দখলে থাকার পর ১১৮৭ সালে মুসলিম বীর সুলতান সালাউদ্দিন আয়ুবী পনুরায় জেরুজালেম শহরকে মসুলমানদের অধিকারে নিয়ে আসেন, ক্রুসেডাররা (crushedar) পরাজিত হলেও তারা পুরো ফিলিস্তিন অঞ্চল চিরদিনের জন্য দখল করে নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা শুরু করে। 

ইহুদিরা তৎকালীন ওসমানীয় শাসক আব্দুল হামিদের কাছে ফিলিস্তিনি জমি কেনার অনুমতি চায় এবং বিনিময়ে উস্মানীয়দের (osmanioder) সমস্ত বিদেশি ঋণ পরিশোধ করে দেয়ার অঙ্গীকার করে, সুলতান এই ষড়যন্ত্র মূলক প্রস্তাব না মানলেও ইহুদিরা গোপনে জমি দখল করতে থাকে। 

১৯১৭ সালে ইংরেজরা ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে ১৯২০ সালের মধ্যে সেখানে পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে এ সময়ে তারা সার স্যামুয়েল হাবার্ড নামে একজন ইহুদিকে সেখানে কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত করে এবং বহিরাগত ইহুদিদের জন্য ফিলিস্তিন উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় । 

বিংশ শতাব্দীর এই মসজিদটি ঘিরে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। ১৯৫১ সালের ২০ জুলাই জর্ডানের রাজা প্রথম আব্দুল্লাহকে এই মসজিদুল আকসাতে জুম্মার নামাজ আদায় করার সময় গুলি করে হত্যা করা হয়। এই আশির দশকেই দুই ইহুদি মসজিদুল আকসার দুটি মসজিদ উড়িয়ে দিয়ার পরিকল্পনা করে ব্যর্থ হয়। 

ফিলিস্তিনে ইহুদিদের পুনর্বাসনে বহু অর্থ সহায়তা প্রদান করে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ইহুদিরা ফিলিস্তিনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। ১৯৪৮ সালের ১৫ই মে বেলফোর ঘোষণার মাদ্ধমে ফিলিস্তিনে জাউনবাদী অবৈধ ইসরাইলি রাষ্ট্র স্থাপিত হয় । 

এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভের সাথে সাথে ইহুদিরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে এবং পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী মসুলমানদের ওপর অত্যাচার শুরু করে। বিপুল সংখক মসুলমান এ সময় ফিলিস্তিন ত্যাগ করে এবং জেরুজালেমে আবারো ইহুদি কর্ত্তিত প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৬৭ সালে ৬ দিনের যুদ্ধ নামে খ্যাত আরব ইসরাইল যুদ্ধে ইসরাইলের বিপক্ষে মিশর, জর্ডান ও সিরিয়া লড়াই করে। মসুলমানরা এই যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মসজিদের আকসার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। এরপর থেকে মসুলমানদের উপর শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন। তখন থেকে ফিলিস্তিনের নির্যাতিত জনগণ আজও তাদের আবাসভূমি ও মসজিদুল আকসা উদ্ধারের জন্য রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এই সংকট আরো বৃদ্ধি পায়, অথচ অন্য কোন রাষ্ট্রই অবৈধ দখলদার ইসরাইলি ইহুদিদের জেরুজালেম নিয়ন্ত্রণের সমর্থন জানায়নি। 

২০১৬ সালের ১৩ই অক্টোবর জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন ইউনেস্কো ভোট গ্রহণের মাধ্যমে ঘোষণা করে মসজিদে আল আকসা কেবলি মসুলমানদের অধিকারে থাকবে এবং এখানে কোনো ইসরাইলের অস্তক্ষেপ বৈধ নয়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হয়নি, বরং ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। 

১৯ শতকের শেষের দিকে ইউরোপে ইহুদিদের প্রতি বিদ্বেষ বাড়তে থাকলে ইহুদিরা নিজেদের জন্য একটি স্বাধীন দেশের আখাঙ্কা করতে থাকে। সে সময় ব্রিটিশরা ফিলিস্তিনে ইহুদিদের উপনিবেশ গড়ে তুলতে স্বক্রিয় সাহায্য করে। রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইল ফিলিস্তিনির দ্বন্দ্ব শুরু হয় তখন থেকেই, আর সেই যুদ্ধ এখনো চলমান।

এ সম্পর্কিত আরও পরুন

আপনার মতামত দিন

Back to top button
%d bloggers like this: