ইতিহাস

সাবমেরিনের মধ্যে মানুষ কিভাবে জীবনযাপন করে | সাবমেরিন কিভাবে কাজ করে

স্টোরি হাইলাইটস
  • সাবমেরিন কি এবং এর ইতিহাস
  • সাবমেরিন কাজ করে কিভাবে
  • সাবমেরিনে অক্সিজেনের যোগান কিভাবে পায়?
  • সাবমেরিনের মধ্যে থেকে বাইরে দেখে কিভাবে?
  • সাবমেরিনের মধ্যে মানুষ কিভাবে জীবনযাপন করে থাকে

সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ হলো এমন একটি বিশাল আকার মেশিন যা এই পৃথিবীর সবথেকে খারাপ পরিস্থিতিতে কাজ করে থাকে। যেখানে নেই কোনো আলোর উপস্থিতি যেখানে বিরাজ করে চির অন্ধকার আর সেই সাথে রয়েছে বাতাসের অভাব, চারদিকে শুধু পানি আর পানি, গভীর সমুদ্রে প্রচন্ড পানির চাপকে প্রতিরোধ করে এগিয়ে চলে সূত্রোপক্ষের দিকে। 

বন্ধুরা ডুবোজাহাজ সম্পর্কে মানুষের কৌতুহলের শেষ নেই, আমার আপনার সাধারণ মানুষের মধ্যে ডুবোজাহাজ সম্পর্কে রয়েছে নানা রকমের প্রশ্ন।

. ডুবোজাহাজ প্রথম কবে আবিষ্কার হয়েছিল এবং এর ইতিহাস কি?

২. ডুবোজাহাজ কত ধরণের হয়?

৩. ডুবোজাহাজ কিভাবে কাজ করে?

৪. ডুবোজাহাজ কিভাবে পানির উপর ভেসে উঠে এবং কিভাবে পানির নিচে চলে যায়?

৫. পানির নিচে অক্সিজেন কিভাবে পায়?

৬. এবং সবচেয়ে গুরুত্বপর্ণ প্রশ্ন ডুবোজাহাজ এর ভিতর মানুষ কিভাবে জীবন যাপন করে থাকে? মাসের পর মাস পানির নিচে থাকে।

আমরা আপনাকে এই বিষয় গুলি জানানোর চেষ্টা করবো।

ভিডিও টি শেষ পর্যন্ত দেখবেন। আমাদের চ্যানেলে যারা প্রথম বার এসেছেন দয়া করে সাবস্ক্রাইব করে ফেলুন এই রকম রোমাঞ্চ কর তথ্য পেতে।

আশা করি ভিডিওটি আপনাদের ভালো লাগবে।

সবার প্রথমে আমরা জানবো সাবমেরিন কি এবং এর ইতিহাস।

সাবমেরিন বা ডুবো জাহাজ হলো পানির গভীরে চলা একধরণের যান বা ওয়াটার ক্রাফট। এটা যে শুধু পানির উপরে চলে তা নয় এটা পানির গভীরেও চলাচল করতে পারে। এরা পানির নিচে স্বাধীন ভাবে বিচরণ করতে পারে। সমুদ্রের গভীরে যাওয়া, সমুদ্রের গভীরতা মাপা এর কাছে খুবই সহজ ব্যাপার।

আর শত্রুর উপর আক্রমণ করার জন্য সাবমেরিন খুবই উপযোগী অস্ত্র। কর্ণীলিয়াস ড্রেবেল কে ডুবোজাহাজ এর আবিস্কারক হিসেবে ধরা হয়। তিনি প্রথম ১৬১৯ সালে পানিতে চলাচল যোগ্য যান এর আবিষ্কার করেন। তিনি ইংল্যান্ড এর রাজা প্রথম জেমস এর অধীনে রাজকীয় নৌবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, ইংল্যান্ড এ প্রথম সাবমেরিন কাঠ দিয়ে বানানো হয়েছিল এবং তা চামড়া দিয়ে মোড়ানো হয়েছিল। এটা পানির ৩ থেকে ৪ মিটার গভিরে যেতে পারতো, তারপর ধীরে ধীরে ডুবোজাহাজ বানানোর প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে। ৮৮ শতাব্দিতে বিভিন্ন ধরণের সাবমেরিন বানানো হয়, ১৮৮০ সালে বাস্প চালিত প্রথম ডুবোজাহাজ আবিষ্কৃত হয় এবং তারপর ডিজেল, গ্যাসোলিন এবং বিদ্যুৎ চালিত ডুবোজাহাজ তৈরি হয়। এগুলার সাহায্যে কয়েকটি সামুদ্রিক যুদ্ধ হয়েছে। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে ডুবোজাহাজ ব্যাপক আকারে ব্যবহার দেখা যায়, ১৯৫০ সালে প্রথমবার নিউক্লিয়ার এনার্জি অর্থাৎ পারমাণবিক শক্তির সাহায্যে সাবমেরিন চালানো হয়। 

বর্তমান দিনে পারমাণবিক শক্তির সাহায্যে চালিত সাবমেরিন বেশি পরিমানে নির্মিত হচ্ছে। এগুলার বডি ষ্টীল দিয়ে বানানো হয়ে থাকে, এতে বিভিন্ন ধরণের আধুনিক টেকনোলজি ব্যবহার হয়ে থাকে। যাতে করে সুমদ্রে লুকিয়ে থাকা শত্রুদের খুব সহজে খুঁজে বের করা যায়। এছারাও সমুদ্র বিজ্ঞানে অনুসন্ধান এবং গবেষণার কাজে সাবমেরিন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বর্তমানে পর্যটকদের আকর্ষণ করার লক্ষে সাগর তোলে নিমজ্জিত প্রত্মতাত্ত্বিক পরিদর্শন এর জন্য ডুবোজাহাজ ব্যবহার করা হয়।

সাবমেরিন কাজ করে কিভাবে

অনেকের মনে প্রশ্ন আস্তে পারে সাবমেরিন কিভাবে চলে এবং কিভাবে পানির ওপর ভাসে আবার পানির নিচে চলে যায়। বিষয়টি তেমন জটিল কিছু নয়, সাবমেরিন মূলত কাজ করে প্রাচীন গ্রিক বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস এর সূত্র অনুযায়ী বেলাস্ট টেংস থিউরির উপর ভিত্তি করে। এই থিউরির উপরে ভিত্তি করেই ১৬২০ সালে ড্রেবেল প্রথম সাবমেরিন আবিষ্কার করেছিলেন ।

সাধারণত জাহাজ যে পরিমান পানি নিজের আয়াতনের জন্য অপসারণ করে তার ওজন জাহাজের ওজনের চেয়েও বেশি হয় তখন জাহাজ পানির ওপর ভাসে, আবার জাহাজের ওজন যদি কোনোভাবে বাড়ানো যায় এবং তার দ্বারা অপসারিত পানি জাহাজের ওজনের থেকে কম হয় তখন জাহাজ ডুবে যাবে। ডুবোজাহাজ পানির ওপর ভাসে কিন্তু এটাকে ডুবানো এবং ভাসানো হয় ওজন বাড়ানো এবং কমানোর মাধ্যমে । 

বিষয়টি আরো সহজ ভাবে বলা যায় একটা বোতলের ভিতর যখন বাতাস থাকে তখন বোতলটি পানির উপরে ভাসে আবার যখন বোতলটিতে পানি ঢুকানো হয় তখন বোতলটি ডুবে যাবে। পানির নিচে যদি কোনোভাবে ওই বোতলের পানি বের করে দিয়ে বাতাস ঢুকানো হয় তখন তা আবার পানির উপর চলে আসবে । ঠিক এই সূত্র অবলম্বন করেই সাবমেরিন পরিচালিত হয়। পানির নিচে ডুব দেওয়ার জন্য সাবমেরিন এ কতগুলা ব্লাস্ট ট্যাংক থাকে। ট্যাংকের ঢাকনা খুলে সেখানে পানি প্রবেশ করানো হয় যাতে সাবমেরিন ভারী হয়ে পানির নিচে চলে যায়, আবার উপরে উঠার দরকার হলে সাবমেরিন এ থাকা কম্প্রেসট এয়ার এর মাধ্যমে ব্লাস্ট ট্যাংক থেকে পানি বের করে বাতাস ঢুকানো হয় এবং তখন এটি হালকা হয়ে পানির ওপরে চলে আসে। তবে এতে করে সাবমেরিন এর ভিতর কোনো রকম চাপের পরিবর্তন হয় না। কারণ এতে উন্নত মানের স্টিল এবং টাইটেনিয়াম এর মতো ধাতু ব্যবহার করা হয়। এই সমস্ত ধাতু দিয়ে সাবমেরিন বানানোর ফলে শুধু ভিতরে নয় বাইরেও প্রচুর পরিমানে পানির চাপ সহ্য করতে পারে। এটাতো গেলো সাবমেরিন পানির উপরে বা নিচে যাওয়ার বেপার। 

আরেকটা প্রশ্ন হলো সাবমেরিন পানির নিচে সামনের দিকে কিভাবে এগিয়ে চলে? সাবমেরিন এর পিছনে একটা প্রপেলার থাকে যেটা ঘোর্ণয়ের মাধ্যমে জাহাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় । সাবমেরিন সাধারণত ঘন্টায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে চলতে সক্ষম ।

সাবমেরিনে অক্সিজেনের যোগান কিভাবে পায়?

আমরা সবাই জানি আমাদের শ্বাসকার্য চালানোর জন্য অক্সিজেন অপরিহার্য। সুমদ্রের নিচে ডুবোজাহাজের মধ্যে অক্সিজিনের অভাব হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। সাবমেরিন এর মধ্যে অক্সিজিনের যোগান দেয়  অক্সিজেন জেনারেটর যেইটা ইলেক্ট্রোরাল পদ্ধতিতে কাজ করে, সাবমেরিন এর মধ্যে অক্সিজেন তৈরি হয় সারাদিন ধরে অথবা কম্পিউটার লো অক্সিজেন ডিডেক্ট করে তখন। যে কার্বন ডাই অক্সাইড সাবমেরিন এ তৈরি হয় তা বাইরে বের করা খুবই জরুরি তা না হলে সাবমেরিন এ থাকা মানুষের ক্ষতি হতে পারে, আর সে জন্য কার্বন ডাই অক্সাইড বের করার জন্য কেমিকেল প্রসেস করা হয়, যেটাকে বলা হয়ে থাকে সোডা লাইম।

সাবমেরিনে শক্তির উৎস? 

সাবমেরিন মূলত দুই ধরণের- ডিজেল ইলেক্ট্রিক ইঞ্জিন এবং নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর বা পারমাণবিক শক্তি চালিত।

আমরা অনেকেই ভাবি ডিজেল এ চালিত সাবমেরিন এর ইঞ্জিন সরাসরি চলে কিন্তু বাস্তবে এমনটি হয় না। ডিজেল ইঞ্জিন এ সাবমেরিন চলতে প্রচুর অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় যেইটা সাবমেরিন এর মধ্যে থাকে না। এছাড়াও ডিজেল ইঞ্জিন প্রচুর পরিমানে ধুয়া উৎপন্ন করে থাকে, যেইটা সাবমেরিন এ থাকা মানুষের জন্য খুবই ক্ষতিকর এবং ডিজেল ইঞ্জিন খুবই শব্দ সৃষ্টি করে । যদি এই ইঞ্জিন প্রধান হয় তাহলে শত্রুরা খুব সহজেই সাবমেরিন খুঁজে পাবে। বাস্তবে এই ডিজেল ইঞ্জিন গুলো একটা জেনারেটর ঘুরায় এবং জেনারেটর থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ সাবমেরিনে থাকা ব্যাটারি গুলি চার্জ করে থাকে আর এই ব্যাটারি চার্জ এর সময় সাবমেরিন উপরে উঠে আসে, আর চার্জ শেষ হলে ব্যাটারি মোটর গুড়ায় এবং মোটরের সাথে কানেক্ট প্রপেলার ঘুরতে থাকে আর এভাবেই পানির নিচে নীরবে চলতে থাকে সাবমেরিন। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক কিছু ডিজেল ইঞ্জিন রয়েছে যেগুলো পানির নিচে অনেক সময় ধরে কাজ করতে পারে।

অপরদিকে বর্তমানে প্রচুর পরিমানে নিউক্লিয়ার সাবমেরিন বানানো হচ্ছে। এই নিউক্লিয়ার সাবমেরিন চলতে কোনোরকম অক্সিজেনের দরকার হয় না তাই আলাদা করে বাড়তি ব্যাটারি এর প্রয়োজন নেই পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে কার্বাইট ঘুড়ানো হয় আর এই ঘুরানো শক্তি দিয়ে প্রপেলারের ঘুরানো হয় এবং সাবমেরিনে বিদ্যুৎ সহ সবধরণের চাহিদা উৎপন্ন করা হয়। এই জন্য নিউক্লিয়ার সাবমেরিনকে বার বার পানির উপরে উঠে আস্তে হয় না।

সাবমেরিনের মধ্যে থেকে বাইরে দেখে কিভাবে?

ডুবোজাহাজের কন্ট্রোল রুম থাকে এর মাঝখানে, সেখান থেকে বাইরে খালি চোখে দেখা প্রায় অসম্ভব। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যবহার করা হয় সনার। সাবমেরিনে যুক্ত সনার সিস্টেম শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে চারপাশের একটি ত্রিমাত্রিক চিত্র প্রদান করে, এই চিত্রে দেখা যায় সাবমেরিনের চারপাশে কি কি আছে। সেখানে সমুদ্রের গভীরতা কত, কোথায় উঁচু, কোথায় নিচু বা কোথায় শত্রুর সাবমেরিন রয়েছে। আবার সমুদ্রের অল্প গভীরতায় অবস্থান করলে পেরিস্কোপ এর মাধ্যমে পানির উপরে যা কিছু আছে সব দেখতে পারে।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপর্ণ বিষয়ে আসা যাক,  সাবমেরিনের মধ্যে মানুষ কিভাবে জীবনযাপন করে থাকে-

যেকোন দেশ রক্ষা করার জন্য সেনাদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপুর্ণ, কিন্তু আপনি কি জানেন দেশ রক্ষার খাতিরে সমুদ্র পথে আগত শত্রুদের উপর নজর রাখার জন্য নেভি সেনাদের কত পরিশ্রম করতে হয়? তারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে সমুদ্রের নিচে থেকে দেশ রক্ষা করে, এর জন্য সেনাদের দরকার হয় সাবমেরিন। সাবমেরিনের মাধ্যমে সেনারা গভীর সমুদ্রে শত্রুদের উপর নজর রাখে। নৌ সমুদ্রে মিশন এতটাই সিক্রেট হয় যে সেনারা মাঝে মাঝে নিজেরাও জানতে পারে না তাদেরকে কোন মিশনে পাঠানো হয়।

পৃথিবীর সবথেকে কঠিন কাজ হলো সাবমেরিনে কাজ করা। সাবমেরিন খুবই কম জায়গা সম্পন্ন জানালাবিহীন একটি জায়গা, যেটা সমুদ্রে ৩০০ থেকে ১০০০ ফিট গভীরে কাজ করে, আর শত্রুদের দূর থেকে চিহ্নিত করে প্রক্সি করে দেয়। আপনি কি জানেন এতে থাকা নৌসেনারা দিনের পর দিন সূর্যের আলো দেখতে পায় না। কখনো কখনো তাদের একমাস সূর্যের আলো দেখার সুযোগ হয় না। সাবমেরিনে সেনারা যখন গভীর সমুদ্রে চলে যায় তখন বাইরের জগতের সাথে তাদের আর কোন সম্পর্ক থাকে না। যোগাযোগ থাকে না পরিবারের আপনজনদের সাথে। তাদের মিশন প্রায় একমাসের হয় । সেনারা আগে থেকে জানতে পারে না তাদের মিশন কবে শেষ হবে। তারা সর্বক্ষণ পানির নিচে কাজ করতে থাকে। সাবমেরিনে থাকা সেনারা দিন রাতের পার্থক্য বুঝতে পারে না। তারা খাবার খাওয়ার জন্য খুবই কম সময় পেয়ে থাকে, গড়ে ১২ থেকে ১৪ মিনিট মাত্র। সাবমেরিনের মধ্যে নানা রকমের যন্ত্রাংশ থাকার কারণে সেখানে খুবই কম জায়গা থাকে ঘুমানোর জন্য, একটা ছুট কেবিনে ৫ থেকে ৬ জনকে শুতে হয় । সেনারা ঘুমানোর জন্য মাত্র ৫ থেকে ৬ ঘন্টা সময় পেয়ে থাকেন। সাবমেরিনে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে যার কারণে একজনের ভুলে পুরো সাবমেরিনের ক্ষতি হতে পারে।

এ সম্পর্কিত আরও পরুন

আপনার মতামত দিন

Back to top button
%d bloggers like this: